প্রতিদিন সকালে এবং বিকালে আপডেট পেতে আমাদের টেলিগ্রামে যুক্ত হোন।
সকাল ছয়টায় ঘুম ভেঙেছে, অথচ এখনও বিছানার চাদরটা ঠিকমতো গোছানো হয়নি। টিউশনির জন্য ছুটতে হবে, কিন্তু তার আগে দ্রুত সেরে নিতে হবে সকালের রান্নাটা। ঢাকায় মেসের এই জীবন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজারো শিক্ষার্থীর নিত্যদিনের চিত্র। আবাসন সংকট তাদের জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা প্রতিনিয়ত তাদের শিক্ষা ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলছে।
এই বাস্তবতার মাঝেই একসময় আশার আলো দেখিয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন প্রকল্প। শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের আন্দোলন ও তীব্র দাবির মুখে সরকার কেরানীগঞ্জে একটি অস্থায়ী আবাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, যেখানে প্রায় ১,৬০০ শিক্ষার্থী দ্রুত মাথা গোঁজার ঠাঁই পাবে বলে আশা করা হয়েছিল। কিন্তু, সেই আশা এখন ফিকে হতে শুরু করেছে।
জবির আবাসন সংকট: স্বপ্নভঙ্গের নতুন অধ্যায়
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, দেশের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠ হওয়া সত্ত্বেও, জন্মলগ্ন থেকেই আবাসন সংকটের সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে। ছাত্রছাত্রীদের জন্য পর্যাপ্ত আবাসিক সুবিধার অভাব দীর্ঘকাল ধরে তাদের শিক্ষাজীবনে এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই সংকট নিরসনে শিক্ষার্থীদের বারবার রাজপথে নামতে হয়েছে। তাদের আন্দোলনের মুখেই একসময় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও সরকার নড়েচড়ে বসে। ফলস্বরূপ, কেরানীগঞ্জের ৭ একর জমিতে প্রায় ১,৬০০ শিক্ষার্থীর জন্য একটি অস্থায়ী আবাসন নির্মাণে ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়।
প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ফারাক: ইউটার্নের আখ্যান
তবে, দ্রুত আবাসন সুবিধা নিশ্চিত করার সেই আশ্বাস প্রায় এক বছর পেরিয়ে গেলেও অধরা রয়ে গেছে। প্রকল্পের কাজ শুরু তো দূরের কথা, এরই মধ্যে পরিকল্পনার মোড় ঘোরানো হয়েছে। সেই একই ২০ কোটি টাকায় অস্থায়ী আবাসনের পরিবর্তে এখন ১০ তলাবিশিষ্ট স্থায়ী ভবন নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই নতুন স্থায়ী প্রকল্পে শিক্ষার্থীর ধারণক্ষমতা ১,৬০০ থেকে কমে মাত্র ৬০০ জনে নেমে এসেছে। অর্থাৎ, একই বাজেটে প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থী তাদের আবাসিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত হতে চলেছে, যা নিঃসন্দেহে একটি বড় ধাক্কা।
শিক্ষার্থীদের মনে প্রশ্ন ও হতাশা
এই অপ্রত্যাশিত পরিবর্তন শিক্ষার্থীদের মধ্যে গভীর হতাশা ও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। যে স্বপ্ন নিয়ে তারা আন্দোলনের মাধ্যমে আবাসন আদায় করেছিল, তা এখন যেন ভেঙে চুরমার হওয়ার পথে। তাদের প্রশ্ন, 'কেন একই টাকায় এত কম শিক্ষার্থীকে আবাসন সুবিধা দেওয়া হচ্ছে?'
আবাসন সুবিধা না পাওয়ায় শিক্ষার্থীদের একদিকে যেমন আর্থিক চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে নিরাপদ ও পড়ালেখার উপযুক্ত পরিবেশ থেকেও তারা বঞ্চিত হচ্ছে। মেস বা সাবলেট ভাড়ায় থাকা শিক্ষার্থীদের প্রতিনিয়ত অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হয়, যা তাদের পরিবারের ওপরও চাপ সৃষ্টি করে।
দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের পথে কাঁটা
জবির আবাসন সংকট কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সামগ্রিক অবকাঠামোগত সমস্যারই প্রতিচ্ছবি। একটি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের জন্য কেবল উচ্চশিক্ষা প্রদানই নয়, তাদের নিরাপদ ও সুস্থ জীবনযাত্রার সুযোগ নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
স্থায়ী আবাসন অবশ্যই কাম্য, কিন্তু শিক্ষার্থীদের তাৎক্ষণিক প্রয়োজন এবং পূর্বে দেওয়া প্রতিশ্রুতির সঙ্গে এই নতুন সিদ্ধান্তের অসামঞ্জস্যতা প্রশ্নবিদ্ধ। দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার নামে যেন বর্তমান শিক্ষার্থীদের বঞ্চনার শিকার না হতে হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতার প্রশ্ন
প্রকল্পের এমন ইউটার্নের পেছনে কী কারণ রয়েছে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা আসা প্রয়োজন। জনতুষ্টির জন্য নেওয়া একটি প্রকল্প যখন বছরের পর বছর আটকে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত তার মূল উদ্দেশ্য থেকে সরে আসে, তখন জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক।
শিক্ষার্থীদের দাবি ও মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হলে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না। ভবিষ্যৎ যেকোনো আবাসন প্রকল্প বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ, বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি, মতামত ও পরামর্শ গ্রহণ করা উচিত।
আগামীর পথ: প্রত্যাশা ও করণীয়
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসন সংকট নিরসন এখন কেবল একটি প্রকল্প নয়, এটি হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্ন ও উচ্চশিক্ষার অধিকারের সঙ্গে জড়িত। কর্তৃপক্ষকে দ্রুত এই বিষয়ে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে হবে এবং দ্রুততার সাথে একটি কার্যকর ও শিক্ষার্থী-বান্ধব সমাধান খুঁজে বের করতে হবে।
২০২৬ সালে দাঁড়িয়েও যদি দেশের অন্যতম একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মেস জীবনের অনিশ্চয়তায় ভোগে, তাহলে তা আমাদের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার জন্য এক কলঙ্কজনক অধ্যায় হয়ে থাকবে। আমরা আশা করি, এই সংকট দ্রুত নিরসন হবে এবং জবির শিক্ষার্থীরা তাদের ন্যায্য আবাসন সুবিধা পাবে।



